নেতানিয়াহু আমাকে কখনো অমান্য করেননি: বিবিসির সাথে আলাপকালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতি নিশ্চিত করলেন ট্রাম্প

**ঢাকা:** বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির অত্যন্ত প্রভাবশালী দুই ব্যক্তিত্ব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম বিবিসির পক্ষ থেকে করা এক বিশেষ জিজ্ঞাসার জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাকে কোনো অবস্থাতেই অমান্য বা অবজ্ঞা করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সমন্বয় নিয়ে নানা মহলে কৌতূহল বিরাজ করছে।

বিবিসির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সারাহ স্মিথের সাথে এক বিশেষ ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। উক্ত কথোপকথনে উঠে আসে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে বিবেচিত ইরানের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা এবং এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রতি ইসরায়েলি নেতৃত্বের আনুগত্যের বিষয়টি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সারাহ স্মিথকে আশ্বস্ত করেন যে, সংবাদমাধ্যমের একাংশে বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে যে ধারণাই থাকুক না কেন, নেতানিয়াহু সর্বদা তার সাথে সমন্বয় রেখেই কাজ করেছেন।

সংবাদটির মূল কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবি যে, নেতানিয়াহু তার কোনো সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছাকে অস্বীকার বা অমান্য করার দুঃসাহস দেখাননি। কূটনৈতিক ভাষায় ‘ডিফাই’ (defy) বা অমান্য করা শব্দটি অত্যন্ত ওজনদার, যা মূলত কোনো দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান ফাটল বা মতানৈক্যকে নির্দেশ করে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, তার প্রশাসনিক মেয়াদে নেতানিয়াহুর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়নি। বরং নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা বা পরামর্শকে গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করেছেন।

বিবিসির সারাহ স্মিথ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিশেষ করে ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ইরান ইস্যুটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের পাশাপাশি ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সবার জানা। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল মার্কিন প্রশাসনের সাথে কতটা একমত হয়ে কাজ করছে, তা নিয়ে সারা বিশ্বের নজর রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে এটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে যে, ইরান ইস্যুতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতির পরিপন্থী কোনো পথে হাঁটেননি।

সারাহ স্মিথের সাথে আলাপকালে ট্রাম্পের বাচনভঙ্গিতে এটি ফুটে ওঠে যে, তিনি নেতানিয়াহুর ওপর তার কর্তৃত্ব এবং প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, ইসরায়েলি নেতা তার কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি, যা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। এই ফোনালাপের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, নেতানিয়াহু ও তার মধ্যেকার বোঝাপড়া অত্যন্ত সুসংহত এবং সেখানে অবাধ্যতার কোনো অবকাশ নেই।

আলোচনাটিতে ইরান প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা বা এর প্রতিকার নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন সেখানে ইসরায়েলের ভূমিকা কী হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ট্রাম্পের উত্তরের মাধ্যমে এটি প্রতীয়মান হয় যে, ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু একই ধারার চিন্তাভাবনা পোষণ করেন। নেতানিয়াহু কখনোই মার্কিন নেতৃত্বের সাথে সরাসরি কোনো দ্বন্দ্বে জড়াননি বা ট্রাম্পের গৃহীত নীতির বিপরীতে কোনো বৈরী অবস্থান গ্রহণ করেননি।

পেশাদার সাংবাদিক সারাহ স্মিথ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে নেতানিয়াহুর সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প জানান, তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার পরিবেশ বজায় ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে অনেক সময় দাবি করা হয় যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে মার্কিন প্রশাসনের পরামর্শ তোয়াক্কা করেন না। কিন্তু ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সমস্ত জল্পনা-কল্পনাকে সরাসরি নাকচ করে দেয়। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, নেতানিয়াহু তাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা বা ‘ডিফাই’ করেননি।

এই সংবাদটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারণ এটি সরাসরি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধানের মুখ থেকে আসা বক্তব্য। বিশেষ করে ইরানের সাথে সামরিক উত্তজনা যখন চরমে, তখন ইসরায়েলি নেতার সাথে তার সুসম্পর্ক ও নিয়ন্ত্রণের দাবি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং মিত্র দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্কের দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।

সারাহ স্মিথের সাথে আলাপচারিতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবারই ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইসরায়েলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশের প্রধানমন্ত্রী তার অবাধ্য হয়ে কোনো কাজ করেননি। এর মাধ্যমে ট্রাম্প তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং বৈশ্বিক মিত্রদের সাথে সুশৃঙ্খল সম্পর্কের দিকটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

সামগ্রিকভাবে, বিবিসির সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কথোপকথনটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল হয়ে রইল। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল মনোভাবের বিষয়টি এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের এই সাফ জবাব—যেখানে তিনি নেতানিয়াহুর অবাধ্য না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন—তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি ঘটেনি। ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ বা রণকৌশল নির্ধারণে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেখানো পথেই হেটেছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেন। ফলে, ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মিত্রতা আরও জোরালো হবে কি না এবং ইরান ইস্যুতে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

বিবিসি তথা সারাহ স্মিথের এই প্রশ্নের বিপরীতে ট্রাম্পের দেওয়া উত্তরটি মূলত একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি। এটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের শাসন আমলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসরায়েলি স্বার্থের মধ্যে একটি গভীর সমন্বয় ছিল, যেখানে ফাটল বা অবাধ্যতার কোনো স্থান ছিল না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে বা ইসরায়েলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর। তবে আপাতত ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Spread the love

By admin