স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী স্পেন—এমন সমীকরণে নবাগত কেপ ভার্দের বড় হারের আশঙ্কাই ছিল বেশি। কিন্তু ফুটবল বিশ্বের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে অভিষেক ম্যাচেই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়েছে দলটি। আর এই অবিশ্বাস্য রূপকথার জন্ম দিয়েছেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। স্প্যানিশ আক্রমণভাগের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো এই গোলরক্ষক ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে সেই কান্না শুধু ইতিহাস গড়ার আনন্দের ছিল না, ছিল চরম আর্থিক সংকটের কারণে জন্মদাত্রী মাকে নিজের জীবনের সেরা মুহূর্তটি মাঠে বসে দেখাতে না পারার আক্ষেপ।

ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেনের মুহুর্মুহু আক্রমণ দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন ভোজিনহা। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডরা মোট ২৭টি শট নিলেও ভোজিনহার দেয়াল ভেদ করতে পারেনি। অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে তিনি দলকে এনে দেন এক ঐতিহাসিক পয়েন্ট। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৪০ বা তদূর্ধ্ব বয়সী কোনো গোলরক্ষকের এটি অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

তবে মাঠের জাদুকরী পারফরম্যান্সের পর শেষ বাঁশি বাজতেই এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে থাকেন এই গোলরক্ষক।

ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে নিজের আবেগের কথা জানাতে গিয়ে ভোজিনহা বলেন, “ম্যাচ শেষে আমি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। আমার বেড়ে ওঠা দাদা-দাদির আদরে, কিন্তু তারা আজ পৃথিবীতে নেই। অন্যদিকে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও ভিসা জটিলতার কারণে আমার মা-ও আজ এখানে আসতে পারেননি।”

ভোজিনহার এই পর্যায়ে আসার পেছনের গল্পটা এক দীর্ঘ সংগ্রামের। ক্যারিয়ারের শুরুতে কেপ ভার্দের ঘরোয়া লিগে খেললেও, সেখান থেকে প্রাপ্ত আয়ে সংসার চলত না। তাই ফুটবল খেলার খরচ ও পরিবারের দায়িত্ব পালনে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাস চালানোকে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে বাসের স্টিয়ারিং হাতে বের হতেন, আর নিজের ডিউটি শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়েই ছুটতেন অনুশীলনে। বছরের পর বছর এই অমানবিক রুটিন মেনেই নিজেকে প্রস্তুত করেছেন তিনি।

কেপ ভার্দেতে ফুটবল এখনো আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভজনক পেশা নয়। আর সেই সীমিত আয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রসেসিং, বিমানের টিকিট ও আনুষঙ্গিক বিপুল খরচ মেটানো এই গোলরক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মাকে গ্যালারিতে দেখার স্বপ্নটা তার অধরাই থেকে গেছে।

অর্থের অভাবে মাকে নিজের জীবনের সেরা মুহূর্তটি মাঠে বসে দেখাতে না পারলেও, স্পেনের বিপক্ষে এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স আর তার জীবনের অদম্য সংগ্রামের গল্প এখন ছুঁয়ে গেছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। ভোজিনহা আজ শুধু কেপ ভার্দের নন, পুরো ফুটবল বিশ্বেরই এক অনুপ্রেরণার নাম।