
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশজুড়ে যে কয়েকটি দল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, তার মধ্যে অন্যতম আর্জেন্টিনা। নীল-সাদা জার্সির প্রতি এই আবেগ শুধু ফুটবলের জন্য নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক ইতিহাস, এক অনুভূতির নাম।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার শুরু মূলত ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে। সেই আসরে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অবিশ্বাস্য নেতৃত্ব, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে “হ্যান্ড অব গড” এবং শতাব্দীর সেরা গোল—সব মিলিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় আলবিসেলেস্তারা।
চার বছর পর ইতালি বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। যদিও দলটি তখন তুলনামূলক দুর্বল ছিল, তবুও ম্যারাডোনার নেতৃত্বে তারা পৌঁছে যায় শিরোপা লড়াইয়ে। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে বিতর্কিত এক পেনাল্টি থেকে আন্দ্রেস ব্রেহমের গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার। টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন সেদিন থেমে যায়।
৩৬ বছর পর নতুন সুযোগ
ঠিক ৩৬ বছর পর ইতিহাস যেন আবারও আর্জেন্টিনার সামনে একই সুযোগ এনে দিয়েছে। এবার সেই দায়িত্ব লিওনেল মেসির কাঁধে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অসাধারণ লড়াইয়ের পর ট্রফি জিতে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেন তিনি।
এখন প্রশ্ন একটাই—২০২৬ বিশ্বকাপে কি আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারবে?
যদি পারে, তাহলে ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম আরও স্বর্ণাক্ষরে লিখবে মেসির দল। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা দুইবার শিরোপা জয়ের ঘটনা খুবই বিরল।
ইতিহাস কী বলছে?
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি দল টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে।
প্রথম দল ছিল ইতালি। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে কিংবদন্তি কোচ ভিত্তোরিও পোজোর অধীনে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তারা। তিনি এখন পর্যন্ত একমাত্র কোচ যিনি টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েছেন।
এরপর আসে ব্রাজিল। ফুটবল সম্রাট পেলের নেতৃত্বে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতে সেলেসাওরা। পরে ১৯৭০ সালে তৃতীয় শিরোপা জিতে স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয় জুলে রিমে ট্রফি।
এখন সেই তালিকায় নাম লেখানোর সুযোগ আর্জেন্টিনার সামনে।
মেসির শেষ বিশ্বকাপ?
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে লিওনেল মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর। তাই অনেকের ধারণা, এটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।
যদিও বয়স বাড়ছে, তারপরও মেসির প্রভাব এখনো কমেনি। মাঠে তার উপস্থিতি, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনো বিশ্বসেরাদের পর্যায়ে রয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র মেসির ওপর নির্ভর করে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে দরকার ভারসাম্যপূর্ণ দল, শক্তিশালী ডিফেন্স, কার্যকর মিডফিল্ড এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স।
বর্তমান আর্জেন্টিনা কতটা শক্তিশালী?
বর্তমান আর্জেন্টিনা দলকে অনেক বিশ্লেষক গত এক দশকের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি মনে করেন।
গোলবারে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, মিডফিল্ডে এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টার এবং আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ—সব মিলিয়ে দলটিতে অভিজ্ঞতা ও তরুণ শক্তির দারুণ সমন্বয় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি কেবল মেসিনির্ভর ফুটবল খেলছে না। বরং পুরো ইউনিট হিসেবেই তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কারা?
তবে আর্জেন্টিনার পথ মোটেও সহজ হবে না।
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দলগুলোও শিরোপার বড় দাবিদার। বিশেষ করে ফ্রান্সের তরুণ দল এবং ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
এছাড়া বিশ্বকাপে ভাগ্য, ইনজুরি ও ম্যাচের চাপও বড় ভূমিকা রাখে। একটি খারাপ ম্যাচ পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র বদলে দিতে পারে।
আবেগ না বাস্তবতা?
বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থকের কাছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে আবেগের বিষয়। সবাই চাইবে বিদায়ের মঞ্চেও ট্রফি হাতে দেখা যাক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকাকে।
কিন্তু আবেগ আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়।
আর্জেন্টিনা অবশ্যই শক্তিশালী দল। তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদারও। তবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
এখন দেখার বিষয়, মেসির আর্জেন্টিনা কি সত্যিই ইতিহাস গড়তে পারে, নাকি বিশ্বকাপ আবারও নতুন কোনো চ্যাম্পিয়নের জন্ম দেয়।
