মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে শান্তির এক ক্ষীণ আশার আলো যখন সবেমাত্র দেখা দিয়েছিল, তখনই সেই আশার প্রদীপটি নিভিয়ে দিল যুদ্ধের নতুন এক ঝলক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মধ্যস্থতার পর লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শোনা গেল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ইসরাইলি বিমানবাহিনীর আকস্মিক এই হামলায় বৈরুতের উপশহরগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, যা কেবল এই দুই দেশের সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে আবারও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গত কয়েকদিন আগে যখন ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন বিশ্বজুড়ে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। মনে করা হয়েছিল, দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর হয়তো এবার শান্তি ফিরবে লেবাননে এবং ইসরাইলের উত্তরের সীমান্ত শান্ত হবে। কিন্তু সেই শান্তি ছিল বালির প্রাসাদের মতো ভঙ্গুর। যুদ্ধবিরতির মাত্র কয়েক দিন পরেই বৈরুতের উপশহরগুলোতে ইসরাইলের বিধ্বংসী হামলা শুরু হয়। একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহরের আকাশ, ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে যায় দিগন্ত। এই হামলা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর ফলে বেসামরিক বসতিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই আকস্মিক হামলার বিষয়ে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, এই হামলা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়া। ইসরাইলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি ভূখণ্ডের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মতে, নিজেদের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হিজবুল্লাহর আগ্রাসন রুখতে এই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যখনই তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসবে, তারা তার কঠোর জবাব দিতে দ্বিধা করবে না।
তবে লেবাননের অভ্যন্তরে এই হামলাকে দেখা হচ্ছে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। বৈরুতের রাস্তায় এখন কেবল আতঙ্ক আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। যারা ভাবছিলেন যে যুদ্ধের বিভীষিকা শেষ হয়েছে এবং তারা তাদের প্রিয়জনদের সাথে শান্তিতে সময় কাটাতে পারবেন, তাদের স্বপ্ন আবারও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বৈরুতের উপশহরগুলোতে এখন কেবল অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে মানুষের আর্তনাদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির কথা বলে বিশ্ব সম্প্রদায় যখন শান্তির কথা বলছিল, ঠিক তখনই ইসরাইল তাদের ওপর বোমাবর্ষণ করে সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে।
এই পুরো ঘটনার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা চালিয়েছিল এবং একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই চুক্তির কার্যকারিতা শূন্য হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, এই সংঘাতের শিকড় কতটা গভীরে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন মধ্যস্থতা কেবল একটি সাময়িক বিরতি এনেছিল, কিন্তু মূল সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারেনি। ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার অবিশ্বাস এবং প্রতিশোধের নেশা এতটাই প্রবল যে, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই তাদের থামানোর জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠেনি।
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের এক বিপজ্জনক চক্রের অংশ। লেবানন এবং ইসরাইলের এই লড়াই কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই। হিজবুল্লাহর পেছনে ইরানের সমর্থন এবং ইসরাইলের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অটুট আস্থা এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখনই কোনো এক পক্ষ কিছুটা পিছিয়ে পড়ে, তারা পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। বৈরুতের এই হামলা সেই শক্তি প্রদর্শনেরই একটি অংশ। এর ফলে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই সংঘাত কেবল লেবাননের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
লেবাননের সাধারণ মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই দেশটির মানুষ এখন কেবল একটু শান্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের এই চক্র তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বৈরুতের উপশহরগুলোতে এখন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন মানুষ। শিশুদের চোখে এখন কেবল ভয়, আর বয়স্কদের দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে হতাশা। তারা বুঝতে পারছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবের লড়াইয়ে তাদের জীবনই সবচেয়ে বড় মূল্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বেসামরিক এলাকায় হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তবে ইসরাইলের মিত্র দেশগুলো তাদের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’কে সমর্থন দিচ্ছে, যা এই সংঘাতের সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলছে। যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দেয়, তখন শান্তি আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
এখন প্রশ্ন জাগে, এই সংঘাতের শেষ কোথায়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা কি পুরোপুরি ব্যর্থ হলো? নাকি এটি কেবল একটি বড় ধরণের ঝড়ের আগের নীরবতা ছিল? সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল এখন হিজবুল্লাহর সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, আর হিজবুল্লাহ চায় তাদের অস্তিত্ব এবং প্রভাব বজায় রাখতে। এই দুই বিপরীতমুখী লক্ষ্যের মাঝে সাধারণ মানুষ কেবল পেষন হয়ে মরছেন। যুদ্ধের এই ইঁদুর দৌড়ে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়, আর এই জেদই বয়ে আনছে ধ্বংস।
পরিশেষে বলা যায়, বৈরুতের উপশহরের সেই ধ্বংসস্তূপ কেবল ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ নয়, তা হলো আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যর্থতার এক করুণ নিদর্শন। মার্কিন মধ্যস্থতার সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ছিল শান্তির এক মিথ্যে প্রতিশ্রুতি। ইসরাইলের পাল্টা হামলা এবং হিজবুল্লাহর আক্রমণ—এই দুইয়ের মাঝে চাপা পড়ে গেছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শান্তির কথা বলা সহজ, কিন্তু যখন অস্ত্রের গর্জন কথা বলে, তখন কূটনীতির সব ভাষা নীরব হয়ে যায়। বৈরুতের আকাশ এখন আবারও কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর সেই ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে এক নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। শান্তির দূতরা এখন কেবল দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন, আর রণক্ষেত্রে রচিত হচ্ছে আরও কিছু করুণ ট্র্যাজেডি।
