যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি ও কূটনৈতিক চাপের পর অবশেষে দুই দেশ একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। তবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে থাকলেও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে দুই দেশ আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছাবে কি না।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা এখনো চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছাইনি। তবে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”

৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আলোচনা

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো সংবেদনশীল বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, উভয় পক্ষ একটি প্রাথমিক কাঠামোতে সম্মত হয়েছে। এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক অনুমোদন ও কিছু ভাষাগত বিষয়ে সমাধানের অপেক্ষা চলছে।

তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো সতর্ক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও কোনো চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সবচেয়ে বড় জটিলতা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

জেডি ভ্যান্সও স্বীকার করেছেন, এই বিষয়টি নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে জটিল আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “কিছু ভাষাগত ও নীতিগত বিষয়ে বারবার আলোচনা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্নে এখনো স্পষ্ট সমাধান আসেনি।”

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান যেন পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেয়। অন্যদিকে ইরান চায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হোক।

ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থান ও আলোচনার কৌশল—দুই পথেই এগোতে দেখা গেছে। একদিকে সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে চাইছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।

ইরানের অবস্থান কী?

ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ মন্তব্য না করলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় ও আধা-রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এমন কোনো চুক্তিতে যেতে চাইবে না যেখানে তাদের সামরিক বা পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সঙ্গে তারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থেকে অর্থনৈতিক স্বস্তিও চায়।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমবে?

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা অনেকটাই কমতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি সাময়িকভাবে হলেও কমবে।

তবে আলোচনার ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ উভয় দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

এদিকে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহল এখন নজর রাখছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। শেষ পর্যন্ত দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Spread the love

By admin