ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

মোটরসাইকেল কেনার জন্য পরিবারের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জেদ করছিলেন কলেজছাত্র আফতাব শাহরিয়ার মাহির (২০)। পরিবারের সদস্যরা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁকে নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর আবদার মেনে নেওয়া হয়। তবে সেই মোটরসাইকেলই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল।

শনিবার সকালে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার চরহোসেনপুর এলাকায় একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন মাহির। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত মাহির নান্দাইল উপজেলার মুসল্লী গ্রামের আবদুল কাইয়ুমের ছেলে। বর্তমানে পরিবারসহ ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকার দত্তপাড়া গ্রামে বসবাস করতেন। তিনি ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার মুদিদোকানের ব্যবসায়ও নিয়মিত সহযোগিতা করতেন।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে মোটরসাইকেলে করে নিজ গন্তব্যে যাচ্ছিলেন মাহির। পথে চরহোসেনপুর এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে তাঁর মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মোটরসাইকেলটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মাহির সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্ধুদের অনেকের মোটরসাইকেল থাকায় মাহিরও একটি মোটরসাইকেল কেনার জন্য বাবার কাছে অনুরোধ করতে থাকেন। শুরুতে তাঁর বাবা এতে রাজি হননি। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বারবার নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাহির অভিমান করে খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দেন এবং বাবার ব্যবসার কাজেও যাওয়া বন্ধ করে দেন। এমনকি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও বলেন।

একপর্যায়ে একমাত্র ছেলের আবদারের কাছে হার মেনে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি নতুন মোটরসাইকেল কিনে দেন তাঁর বাবা। কিন্তু মাত্র চার মাসের মধ্যেই সেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মাহির।

হাসপাতালে ছেলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাহিরের বাবা আবদুল কাইয়ুম বলেন, “ছেলের অনেক ইচ্ছা ছিল মোটরসাইকেল চালানোর। ওর আবদার পূরণ করতেই বাইক কিনে দিয়েছিলাম। কখনো ভাবিনি এই বাইকই আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে চিরদিনের জন্য কেড়ে নেবে।”

মাহিরের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর নানিও। তিনি বলেন, সকালে নাতির জন্য খাবার তৈরি করে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই খাবার আর খেতে ফেরা হলো না মাহিরের।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদ মোশারফ জানান, মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক তরুণ নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেলের প্রতি আগ্রহ বাড়লেও সড়কে নিরাপত্তা ও সচেতনতার অভাব অনেক সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাহিরের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

Spread the love

By admin