বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের বৈষম্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বৈষম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অর্থনীতিবিদরা এটিকে ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছেন। একদিকে ধনীরা আরও সম্পদশালী হচ্ছেন, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের আর্থিক চাপ বাড়ছে।

সম্পদের বড় অংশ এখন অল্প কিছু মানুষের হাতে

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে দেশের সম্পদ ধীরে ধীরে উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে মোট জাতীয় সম্পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল শীর্ষ ধনী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে সেই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে “কে-শেপড ইকোনমি” বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ অর্থনীতির একটি অংশ দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, আরেকটি অংশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। ফলে একই দেশে বসবাস করেও মানুষের আর্থিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে পড়ছে।

বিনিয়োগ থেকেই আসছে বড় মুনাফা

ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিনিয়োগ। সাধারণ মানুষ যেখানে তাদের আয়ের বেশিরভাগ অংশ দৈনন্দিন খরচে ব্যয় করতে বাধ্য হয়, সেখানে ধনীরা অতিরিক্ত অর্থ শেয়ারবাজার, আবাসন খাত এবং বিভিন্ন আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করেন।

গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। বিশেষ করে বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় যেসব ব্যক্তি বা পরিবার আগে থেকেই বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছিলেন, তারা বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন।

একই সময়ে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে যে পরিমাণ সুদ পাওয়া গেছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা তার তুলনায় অনেক বেশি লাভ করেছেন। ফলে বিনিয়োগের সুযোগ থাকা এবং না থাকার মধ্যে সম্পদের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে।

আবাসন বাজারে সুবিধা পেয়েছেন ধনীরা

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতও বৈষম্য বৃদ্ধির বড় একটি কারণ। করোনাভাইরাস মহামারির পর বাড়ির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। কম সুদের সময় অনেক ধনী পরিবার স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে বাড়ি কিনেছেন বা পুরোনো ঋণ পুনর্বিন্যাস করেছেন।

পরবর্তীতে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় নতুন ক্রেতাদের জন্য বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো উচ্চ সুদের কারণে আবাসন বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না।

অন্যদিকে যাদের আগে থেকেই একাধিক বাড়ি বা সম্পত্তি ছিল, তারা সম্পদের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও লাভবান হয়েছে। ফলে সম্পত্তির মালিক ও অ-মালিকদের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর

মূল্যস্ফীতি সব মানুষের ওপর একইভাবে প্রভাব ফেলে না। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় করে।

যখন খাদ্যপণ্য ও আবাসন খরচ বাড়ে, তখন তাদের ব্যয়ের চাপও অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু উচ্চ আয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে এসব খরচ মোট আয়ের তুলনায় তুলনামূলক কম অংশ জুড়ে থাকে। ফলে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা তারা সহজে সামাল দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় বেশি ছিল। এর ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।

খরচের ধরণেও দেখা যাচ্ছে পার্থক্য

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। অনেকেই বিনোদন, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ সীমিত করেছেন।

কিন্তু উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তারা ভ্রমণ, বিলাসপণ্য, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় অব্যাহত রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ আয়ের মানুষের শক্তিশালী ভোগব্যয় অর্থনীতির কিছু খাতকে সচল রাখলেও এটি বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তি ও পুঁজির সুবিধা

বর্তমান অর্থনীতিতে প্রযুক্তি কোম্পানি ও আর্থিক খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যাদের হাতে শেয়ার, ব্যবসা বা বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি রয়েছে তারা প্রযুক্তি খাতের উত্থান থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছেন।

অন্যদিকে শুধুমাত্র বেতনের ওপর নির্ভরশীল কর্মজীবী মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। ফলে সম্পদের বৃদ্ধি ও আয়ের বৃদ্ধির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদ বৈষম্য এভাবে বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করবে।

এ কারণে করনীতি, আবাসন নীতি, শিক্ষা ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই বৈষম্য কমানো সহজ নয়, কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে সম্পদ থেকেই নতুন সম্পদ তৈরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি।

উপসংহার

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে ধনী হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সম্পদের মালিক হওয়া। যাদের হাতে বাড়ি, শেয়ার এবং বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি রয়েছে, তারা বাজারের উত্থান থেকে ক্রমাগত লাভবান হচ্ছেন। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যয়বহুল আবাসন এবং ঋণের চাপে সাধারণ মানুষের জন্য সম্পদ গড়ে তোলা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ব্যবধান শুধু বাড়ছেই না, অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

Spread the love

By admin