নিজস্ব প্রতিবেদক | লক্ষ্মীপুর
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় শোক, আতঙ্ক ও রহস্য—সবকিছুই যেন একসঙ্গে ঘিরে ধরেছে পুরো এলাকাকে। চার দিন পেরিয়ে গেলেও কেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে।
এদিকে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে কিশোর জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। দাফন শেষে আবারও যখন সে তাদের ভাড়া বাসায় ফিরে আসে, তখন দরজায় ঝুলছিল বড় একটি তালা। যে ঘরে একসময় মা ও তিন বোনের হাসি-কান্না ছিল, সেই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় নীরবে তাকিয়ে থাকে সে।
নীরব দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর
রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার পাঁচতলা ভবনের নিচে সোমবার দুপুরে মানুষের ছোট্ট একটি ভিড় দেখা যায়। সবার দৃষ্টি ছিল এক কিশোরের দিকে। আকাশি রঙের শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা ১৬ বছরের সিফাত চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল নিজের বাসার সামনে।
রোববার কুমিল্লার হোমনায় মা ও তিন বোনকে দাফন শেষে মামার সঙ্গে রায়পুরে ফিরে আসে সে। বাসার দরজা তালাবদ্ধ। ভেতরে আর কেউ অপেক্ষা করছে না। তবুও যেন স্মৃতির টানে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে সিফাত।
প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারেনি সে। পাশে থাকা এক সহপাঠী শুধু তাকে জড়িয়ে ধরে রাখে।
‘সব শেষ হয়ে গেছে’
সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে সিফাত জানায়, এই ঘরেই ছিল তার পুরো পৃথিবী। মা ও তিন বোনকে হারিয়ে সে এখন সম্পূর্ণ একা।
তার ভাষায়, এই ঘর আগের মতোই আছে, কিন্তু যাদের জন্য ঘর ছিল, তারা আর কেউ নেই। জীবনের সবকিছু যেন মুহূর্তেই বদলে গেছে।
যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড
গত বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে—সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার সিপা (১০)-কে।
ঘটনার পর পালানোর সময় সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পরদিন নিহত চারজনের জানাজা শেষে কুমিল্লার হোমনায় তাদের দাফন করা হয়।
তদন্তে বদলাচ্ছে প্রাথমিক ধারণা
শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, স্বর্ণালংকার ও টাকা লুটের উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী তল্লাশিতে পুলিশ বাসা থেকেই স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ উদ্ধার করে।
ফলে তদন্তকারীদের ধারণা, কেবল লুটপাটই হয়তো এই হত্যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ছোট বোনের স্মৃতিতে ভেঙে পড়া সিফাত
পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য ফাতেমা আক্তার সিপা ছিল সিফাতের অত্যন্ত আদরের। বাসার প্রতিটি কোণে তার ছোট বোনের স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে।
তালাবদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার শুধু বোনের নাম উচ্চারণ করে সে। এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেনি।
